সিপন আহমেদ, মানিকগঞ্জ
১৬ জানুয়ারি, ২০২৬, 9:21 PM
উত্তরাধিকার ও উত্তরণের সন্ধিক্ষণে তারেক রহমান
বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তরাধিকার একদিকে যেমন গর্বের, তেমনি অন্যদিকে কঠিন এক পরীক্ষার নাম। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান হওয়া নিঃসন্দেহে বিরল সম্মানের বিষয়। তবে এই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে প্রবল প্রত্যাশা ও নিরন্তর তুলনার চাপ। মানুষ শুধু নাম নয়, কাজ, আচরণ ও সিদ্ধান্তে দেখতে চায় পূর্বসূরিদের প্রতিচ্ছবি কিংবা তার চেয়েও উন্নত কিছু।
জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে নাগরিক শোকসভায় আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান যে বক্তব্য রেখেছেন, তা মূলত এই বাস্তবতারই স্বীকৃতি। তাঁর কথায় উঠে এসেছে—তারেক রহমানের সামনে গর্বের পাশাপাশি শঙ্কার কারণও রয়েছে। কারণ, তাঁকে বিচার করা হবে ইতিহাসের মানদণ্ডে।
গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন জীবনের অবসান ঘটিয়ে তারেক রহমান দেশে ফেরার পর থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ জনপরিসরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের পর একজন নেতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং সেই উপস্থাপন কতটা বিশ্বাসযোগ্য।
স্মরণসভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখন তারেক রহমানের সামনে দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন তারেক রহমানের উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানানো এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় মহাসচিবের তাঁকে বসিয়ে দেওয়া—এই দৃশ্য রাজনীতিতে সৌজন্যবোধ ও পারস্পরিক সম্মানের একটি বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচিত হয়েছে। দলের চেয়ারপারসন হয়েও সিনিয়র নেতাকে সম্মান জানানোর এই আচরণ অনেকের চোখে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
এ ধরনের আচরণ শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। গত ১০ জানুয়ারি সম্পাদক, প্রকাশক ও বার্তা সম্পাদকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় তারেক রহমান নিজে গিয়ে উপস্থিত সকলের সঙ্গে পরিচিত হন, করমর্দন করেন—এমনকি ক্যামেরাম্যানদের সঙ্গেও।
বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে আমরা দেখি নেতা বা বিশেষ ব্যক্তিরা আসনে বসার পর একজন একজন দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দেন। অর্থাৎ নেতা বা বিশেষ ব্যক্তিদের সঙ্গে অন্যদের মধ্যে দূরত্ব একটি প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতি, সেখানে এ ধরনের আচরণ ব্যতিক্রম হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
গুলশানে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে নিবন্ধিত শিক্ষকদের আন্দোলনের সময় গাড়ি থেকে নেমে সরাসরি তাঁদের সঙ্গে কথা বলা কিংবা ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদীর কবর জিয়ারতকালে এক যুবকের গালিগালাজের ঘটনায় পুলিশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ—এসব ঘটনাও তারেক রহমানের সহনশীলতা ও ভিন্ন রাজনৈতিক আচরণের ইঙ্গিত দেয়।
তবে রাজনীতিতে ব্যক্তিগত ভদ্রতা বা সৌজন্যই শেষ কথা নয়। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মূল্যায়নের মূল মানদণ্ড হলো—দূরদর্শী চিন্তা ও বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা। ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান যখন বলেছিলেন, “I have a plan”, তখন অনেকেই সেটিকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকে সেক্টরভিত্তিক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি সেই বক্তব্যের কিছুটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
ঢাকার পানির সংকট, কৃষকদের ভবিষ্যৎ, ৩৮ শতাংশ তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান—এসব বিষয়ে তাঁর বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে দেড় কোটি কৃষকের মাধ্যমে ২০ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনা এবং প্রান্তিক কৃষকদের নিয়ে আলাদা পরিকল্পনার কথা বলা বর্তমান বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কৌশল, আর্থিক কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এখনো অপেক্ষমাণ। কারণ রাজনীতির ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—ভালো পরিকল্পনার চেয়েও কঠিন হলো তার বাস্তব প্রয়োগ।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, তারেক রহমান এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি চাইলে শুধু উত্তরাধিকার বহনকারী নেতা হিসেবেই থেকে যেতে পারেন, আবার চাইলে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় ও দর্শন দিয়ে নতুন অধ্যায়ও রচনা করতে পারেন। জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে ইতিহাসে কোথায় স্থান দেবেন—তার উত্তর নির্ভর করবে আগামী দিনে তাঁর সিদ্ধান্ত, কর্মসূচি ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার ওপর।
সম্ভাবনা আছে, প্রত্যাশাও আছে। এখন দেখার বিষয়—সেই প্রত্যাশা কতটা বাস্তবে রূপ নেয়।
লেখক: সিপন আহমেদ, সাংবাদিক
১৬ জানুয়ারি ২০২৬, শুক্রবার