ডেস্ক রিপোর্ট
২৫ জুলাই, ২০২৬, 9:51 PM
প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত ও প্রশিক্ষণার্থী পুনরাবৃত্তি রোধে সমন্বিত তথ্যব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব
দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং প্রশিক্ষণ শেষে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ইনফরমাল সেক্টর ইন্ডাস্ট্রি স্কিলস কাউন্সিলের
এন্টারপ্রাইজভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পর্যটন অডিটোরিয়ামে “আইএসআইএসসি–ইবিটি বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা কর্মশালা” আয়োজন করে ইনফরমাল সেক্টর ইন্ডাস্ট্রি স্কিলস কাউন্সিল।
অ্যাসেট প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়নাধীন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের বর্তমান অগ্রগতি পর্যালোচনা, বাস্তবায়নগত সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ ছিল কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব জনাব মোঃ দাউদ মিয়া, এনডিসি।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব প্রকৌশলী মোঃ আবুল খায়ের মোঃ আক্কাস আলী; কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) সামসুর রহমান খান এবং অ্যাসেট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব প্রকৌশলী মীর জাহিদ হাসান।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন ইনফরমাল সেক্টর ইন্ডাস্ট্রি স্কিলস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মির্জা নুরুল গনি শোভন। তিনি অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন।
স্বাগত বক্তব্যে আইএসআইএসসি চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশের বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠী অনানুষ্ঠানিক খাতের বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। তাঁদের অনেকের বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, স্বীকৃত দক্ষতা এবং উন্নত কর্মপরিবেশের সুযোগ এখনো সীমিত। এন্টারপ্রাইজভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ ব্যবধান কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা এবং অ্যাসেট প্রকল্পের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান। প্রশিক্ষণের মান, নিয়মিত উপস্থিতি, মূল্যায়ন এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের অনুরোধ করেন তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব জনাব মোঃ দাউদ মিয়া, এনডিসি বলেন, অনানুষ্ঠানিক খাত দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং সেবা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এ খাতের কর্মীদের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, স্বীকৃত দক্ষতা এবং নিরাপদ কর্মপদ্ধতির আওতায় আনা গেলে তাঁদের উৎপাদনশীলতা ও আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
তিনি বলেন, শুধু প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি বা প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করাকে সফলতা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। একজন প্রশিক্ষণার্থী বাস্তবে কতটুকু দক্ষতা অর্জন করেছেন, মূল্যায়নে সক্ষম হয়েছেন এবং প্রশিক্ষণ শেষে চাকরি বা স্বকর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন—সাফল্যকে সেই ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে।
দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, প্রকল্প এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মধ্যে পুনরাবৃত্তি রোধের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন প্রধান অতিথি। তিনি বলেন, একই প্রশিক্ষণার্থী যেন একাধিক প্রকল্প বা কর্মসূচিতে বারবার প্রশিক্ষণ গ্রহণ না করেন এবং একই এলাকা বা একই লক্ষ্যগোষ্ঠীর জন্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে একই ধরনের প্রশিক্ষণ পরিচালিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
এ ধরনের পুনরাবৃত্তির কারণে সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হয় এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ থেকে নতুন ও প্রকৃতভাবে যোগ্য ব্যক্তিরা বঞ্চিত হন বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচনের আগে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
প্রধান অতিথি আরও বলেন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে স্থানীয় ও জাতীয় শ্রমবাজারের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। যে পেশায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত অথবা ইতোমধ্যে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, সেখানে পুনরায় প্রশিক্ষণ পরিচালনার আগে যথাযথ চাহিদা নিরূপণ করা প্রয়োজন। প্রশিক্ষণের সুযোগ প্রকৃত বেকার, কর্মহীন এবং দক্ষতা অর্জনে আগ্রহী জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোঃ আবুল খায়ের মোঃ আক্কাস আলী প্রশিক্ষণের গুণগত মান, প্রশিক্ষণার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, অনানুষ্ঠানিক খাতের জন্য প্রশিক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে বলে মানদণ্ড শিথিল করার কোনো সুযোগ নেই। প্রশিক্ষণস্থলে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, প্রশিক্ষণ উপকরণ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী, অগ্নিনিরাপত্তা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রশিক্ষণার্থীকে শুধু কাজ শেখালেই হবে না; নিরাপদভাবে এবং পেশাগত শৃঙ্খলার সঙ্গে কাজ করতেও শেখাতে হবে।
প্রশিক্ষণার্থীদের নিবন্ধন, উপস্থিতি, প্রশিক্ষণের অগ্রগতি, মূল্যায়ন এবং কর্মসংস্থানের তথ্য অ্যাপ্রোমিসে নিয়মিত ও নির্ভুলভাবে হালনাগাদ করার আহ্বান জানান তিনি। কাগজপত্র ও ডিজিটাল তথ্যের মধ্যে কোনো অসংগতি থাকলে তা দ্রুত সংশোধনের নির্দেশনাও দেন।
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) জনাব সামসুর রহমান খান চলমান প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, প্রতিটি ব্যাচের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনো ব্যাচ পিছিয়ে থাকলে বিলম্বের কারণ চিহ্নিত করে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণসহ পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন ও বিল পরিশোধের কার্যক্রমের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় বজায় রাখারও আহ্বান জানান তিনি।
অ্যাসেট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মীর জাহিদ হাসান বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন, এন্টারপ্রাইজভিত্তিক প্রশিক্ষণের মূল বৈশিষ্ট্য হলো বাস্তব কর্মপরিবেশে হাতে-কলমে দক্ষতা অর্জন। প্রশিক্ষণ শুধু শ্রেণিকক্ষ, উপস্থিতি বা সনদ প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
তিনি বলেন, প্রশিক্ষণার্থীকে পেশাগত মানদণ্ড অনুযায়ী দক্ষ করে তোলা, মূল্যায়নের জন্য প্রস্তুত করা এবং প্রশিক্ষণ শেষে চাকরি, শিক্ষানবিশি অথবা স্বকর্মসংস্থানে যুক্ত করাই এ কার্যক্রমের প্রধান লক্ষ্য। প্রশিক্ষণের শুরু থেকেই সম্ভাব্য নিয়োগদাতা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র চিহ্নিত করার পরামর্শ দেন তিনি।
প্রকল্প পরিচালক প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচন, উপস্থিতি, প্রশিক্ষণ উপকরণ, প্রশিক্ষকের সক্ষমতা, মূল্যায়নের প্রস্তুতি, কর্মসংস্থান অনুসরণ এবং তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান। কর্মশালায় চিহ্নিত প্রতিটি সমস্যার বিপরীতে করণীয়, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
কর্মশালায় উপস্থাপিত অগ্রগতি প্রতিবেদনে জানানো হয়, আইএসআইএসসির অধীনে দ্বিতীয় পর্যায়ে মোট ৫৫৯টি ব্যাচে ১৩ হাজার ৪১৬ জন প্রশিক্ষণার্থী ভর্তি হন। তাঁদের মধ্যে ১৩ হাজার ৩৬৩ জন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন এবং প্রশিক্ষণ থেকে বাদ পড়েছেন ৫৩ জন। এ পর্যায়ে মোট ৬২টি পেশায় প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়েছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে ১১ হাজার ৭৩৬ জন প্রশিক্ষার্থীর মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৯ হাজার ৭৯৮ জন সক্ষম ঘোষিত হয়েছেন, যা মূল্যায়নে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এ পর্যায়ে ৬ হাজার ৭৬০ জন প্রশিক্ষণার্থী কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন বলে অগ্রগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তৃতীয় পর্যায়ে মোট ১ হাজার ২৮৩টি অনুমোদিত ব্যাচের মধ্যে ১ হাজার ১৯৪টি ব্যাচ সক্রিয় রয়েছে। এসব ব্যাচে ২৮ হাজার ৬৫৬ জন প্রশিক্ষণার্থী ভর্তি হয়েছেন। ইতোমধ্যে ৮১৩টি ব্যাচের ১৮ হাজার ৬৮৮ জন প্রশিক্ষার্থীর মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে ১৬ হাজার ৮১৯ জন সক্ষমতা অর্জন করেছেন।
চতুর্থ পর্যায়ে মোট ১ হাজার ৭৪০টি অনুমোদিত ব্যাচে ৪১ হাজার ৭৬০ জন প্রশিক্ষণার্থী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ২০৩টি ব্যাচের ৪ হাজার ৬৬৮ জন প্রশিক্ষার্থীর মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়েছে এবং ৪ হাজার ২১১ জন সক্ষম ঘোষিত হয়েছেন।
কর্মশালায় প্রশিক্ষণ বাস্তবায়নের বর্তমান অগ্রগতি, মূল্যায়ন, কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণার্থীর তথ্য যাচাই, প্রশিক্ষণের পুনরাবৃত্তি রোধ, বিল পরিশোধ, গুণগত মান, নিরাপত্তা এবং মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বাস্তবায়ন পর্যায়ের অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয় তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, অ্যাসেট প্রকল্প, আইএসআইএসসি, প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।