বিশেষ প্রতিবেদক
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, 8:43 PM
‘নিজেই ঠিকাদার, নিজেই প্রকৌশলী’ আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ (পর্ব-2)
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে চাকরির আড়ালে অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, একই জেলায় ২৬ বছরের চাকরিজীবনে সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নানা অনিয়মের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ‘নিজেই ঠিকাদার, নিজেই প্রকৌশলী’ হিসেবে কাজ করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আব্দুল মালেকের গাইবান্ধা, ঢাকা ও রহনপুরে জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাটসহ বিভিন্ন সম্পদ রয়েছে। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও উত্তরায় একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগও উঠেছে। পাশাপাশি গরুর খামারসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
আব্দুল মালেক ২০০০ সালে উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বেতনের বাইরে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। গাইবান্ধা শহরের কোর্ট এনলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় তাঁর জমি, বাড়ি ও ব্যবসায়িক সম্পদ রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের অভিযোগ, রহনপুর পৌরসভায় সহকারী প্রকৌশলী ও সমাজ উন্নয়ন কর্মকর্তার অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য আড়ালে থেকে যাচ্ছে। সূত্রটির দাবি, রহনপুর উপজেলা পরিষদের সামনে প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার সাইদুল ইসলামের অফিসে আব্দুল মালেক নিয়মিত সময় কাটান। পৌরসভার অধিকাংশ কাজ তিনি সাইদুল ইসলামের মাধ্যমে করান বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রহনপুর পৌরসভার ক্লিনিকের জন্য বরাদ্দ ছিল ৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৪ কোটি টাকার দৃশ্যমান কাজ হলেও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রায় ৪ কোটি টাকার কাজ ২ কোটি ৫০ লাখ টাকায় শেষ করে প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
লিনিকের কাজ একটি নির্দিষ্ট কমিটির মাধ্যমে সম্পাদনের নির্দেশনা ছিল। যে কমিটির যে দায়িত্ব, সেই কমিটির তা পালনের কথা থাকলেও কমিটির অগোচরেই কাজ শেষ করা হয়েছে। এমনকি পৌরসভার কর্মসম্পাদন কমিটির সদস্যরাও লিনিকের প্রকল্পের কাজ সম্পর্কে জানেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া পৌরসভার বিশেষ বরাদ্দ অবৈধভাবে উত্তোলন এবং হাটবাজারের একাধিক চেক তাঁর নামে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়গুলো তদন্ত করলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এডিপি বরাদ্দ ও কোটেশনের মাধ্যমে রহনপুর পৌরসভায় থাকাকালে বিধিবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, বড়গ্রাম পৌরসভার বিভিন্ন টেন্ডারবাজির সঙ্গেও আব্দুল মালেকের নাম রয়েছে। নাচোল পৌরসভায়ও অনিয়ম ও নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার করে কাজ শেষ করার অভিযোগ রয়েছে। আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে অন্যতম গুরুতর অভিযোগ হলো—সরকারি প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ঠিকাদারি কাজের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। রহনপুর পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ঠিকাদারি কাজের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আব্দুল মালেকের একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট রয়েছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও উত্তরার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতেও তাঁর সম্পদ থাকার দাবি উঠেছে। তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য ও অর্থের উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস, রাজউক, আয়কর নথি ও সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনা করলে এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের মত। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, রহনপুর পৌরসভার মডেল স্কুলসংলগ্ন এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানেও আব্দুল মালেকের জমি রয়েছে। চাকরি থেকে প্রাপ্ত আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
এ বিষয়ে গোমস্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও রহনপুর পৌরসভার প্রশাসক মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আপনাদের প্রথম পর্বের নিউজে দুদকে অভিযোগের কথা বলা আছে। যদি কোনো ব্যবস্থা নেয়, তাহলে তারা নেবে। আর প্রশাসক হিসেবে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললে আমরা একটি চিঠি ইস্যু করতে পারি।’
প্রথম পর্বের সংবাদ প্রকাশের আগে এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আব্দুল মালেকের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রতিবারই তিনি ব্যস্ত বলে ফোন কেটে দেন। পরে এসএমএসের মাধ্যমে জানান, ‘ব্যস্ততার কারণে আপনার ফোন ধরতে পারিনি। এই কারণে আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’ অভিযোগগুলো লিখিতভাবে পয়েন্ট আকারে পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। তবে দ্বিতীয় পর্বের সংবাদ প্রকাশের আগে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
চোখ রাখুন, তৃতীয় পর্বে-